NAVIGATION MENU

‘এই পুলিশ সেই পুলিশ নয়’


ঢাকা: মাত্র পাঁচ দিন আগেই ঢাকা মহানগর পুলিশের নতুন কমিশনার মোঃ শফিকুল ইসলাম ঘোষণা করেছিলেন যে,তাঁর অধীনস্থ কোনো থানায় যদি মানুষ পর্যাপ্ত সেবা ও ভালো আচরণ না পায়,তাহলে তাদের সরিয়ে সিনিয়র অফিসারদের থানায় এনে বসানো হবে।

ঘোষণা দিয়েই দায়িত্ব শেষ করেননি তিনি। লিখিত নির্দেশ জারি করেছেন থানা পুলিশের হয়রানিমুক্ত সেবা নিশ্চিত করতে উপ-পুলিশ কমিশনারদের থানায় নিয়মিত বসার।

আর এই নির্দেশ পেয়ে দ্রুত বদলে যাছে ঢাকা মহানগর পুলিশ। বৃহস্পতিবার এই রকম একটি ঘটনার প্রমাণ মিলেছে রাজধানীর খিলক্ষেত থানায়। আগে মামলা করতে গেলে থানা পুলিশদের মোটা অংকের টাকা দিতে হতো বলে অভিযোগ আছে।

কিন্তু এখন বাদীর অভিযোগ সঠিক হলে গভীর রাতেও অভিযোগকারীর বাসায় গিয়ে পুলিশ মামলার এজাহার নিয়ে আসছে এবং মামলা রেকর্ডও করছে সাথে সাথেই। আসামি পালানোর আশংকা থাকলে মামলা দায়ের করার আগেই গ্রেপ্তার করছে আসামিকে।

রাজধানীর খিলক্ষেত এলাকার ক-২০৫/১ বাড়ির চারতলার ফ্লাটে আবদুল্লাহ আল তারিক তার নিজের শিশু সন্তান আরহানকে সাবেক স্ত্রী শাওন রোমাইলার কাছে থেকে নিয়ে আসেন। ১৭ সেপ্টেম্বর সামান্য বিষয়কে কেন্দ্র করে সন্তানকে বেদমভাবে পিটিয়ে সারা শরীর রক্তাক্ত করে দেন।

শিশুটিকে বাঁশের লাঠি এবং পাইপ দিয়ে অমানবিকভাবে পিটানো হয়। মারধর সহ্য করতে না পেরে শিশুটি বাসা থেকে পালিয়ে পাশেই তার ফুফু সুমাইয়ার বাসায় খালি পায়ে এবং খালি গায়ে চলে যায়।

শিশুটির সারা শরীরের বিভিন্ন জায়গায় ভয়াবহ নির্যাতনের চিহ্ন। নির্মম এই নির্যাতনের শিকার হয়েছেন রাজধানীর খিলক্ষেতে ১১ বছরের এক শিশু। নির্যাতক ছেলেটির বাবা। ছবি : সংগ্রহীত 


সেখান থেকে তার ফুফু উবারের গাড়ী ডেকে শিশুটিকে একাই মায়ের কাছে পাঠিয়ে দেয়। ছেলেকে দেখে কান্নায় ভেঙ্গে পড়েন মা শাওন শরমিলা। ছেলেকে হলি ফ্যামিলি হাসপাতালে নিয়ে ভর্তি  করাতে গিয়ে সাবেক স্বামীর হুমকিতে পালিয়ে এসে ধানমন্ডির এক বান্ধবীর বাসায় আশ্রয় নেন।

আরো পড়ুনঃ

নারী-শিশু নির্যাতনকারীদের জামিন বিষয়ে কঠোর হওয়ার সময় এসেছে : আইনমন্ত্রী

ছেলেকে তার বাবা অপহরণ করতে পারে এই ভয়ে আরহানকে আরেকজনের বাসায় রেখে আসেন। থানা পুলিশের কাছে অভিযোগ দিতেও ভয় পাচ্ছেন শাওন শরমিলা। কারণ খিলক্ষেত এলাকার খুব প্রভাবশালী তাঁর স্বামী তারিকের পরিবার। এই পরিস্থিতে এগিয়ে আসে আতিয়া বিলকিস মিতু নামে শরমিলার এক বান্ধবী।

সে তাঁর পূর্ব পরিচিত বাংলাদেশ পোস্টের এক বিশেষ প্রতিবেদককে জানান। পরে ফেসবুকে সাহায্য চেয়ে বাংলাদেশ পোস্ট প্রতিবেদক পোস্ট দিলে বাংলাদেশ পুলিশের বিভিন্ন অফিসারদের নজরে আসে খুব দ্রুত তাদের মধ্যে ডিএমপির যুগ্ন-কমিশনার ( অপরাধ) শেখ নাজমুল আলম, পুলিশ সদর দপ্তরের এআইজি (মিডিয়া) সোহেল রানা, ওয়ারি ডিভিশনের এডিসি ইফতেখাইরুল ইসলাম ইফতি, গুলশান ডিভিশনের এডিসি মোস্তফা মামুন অন্যতম।

তারা পেশাগত দায়িত্ববোধ অনুধাবন করে  ভিক্টিম শিশু এবং তার অসহায় মায়ের পাশে আইনগত সাহায্য নিয়ে দাঁড়ান। কেউ কেউ নিজেরাই কথা বলেন শিশুটির মায়ের সাথে। তাকে অভয় দেন। ডিএমপির যুগ্ন-কমিশনার ( অপরাধ) শেখ নাজমুল আলম নিজেই খিলক্ষেত থানার ওসি মোঃ মোস্তাফিজুর রহমানকে সার্বিকভাবে  বিষয়টি জানান। প্রাথমিক তদন্তে ঘটনার সত্যতা পাওয়া গেলে ওসি তাকে জানায় যে, অভিযুক্ত তারিক আমেরিকার ইমিগ্রান্ট এবং সেখানকার বড় ব্যবসায়ী।

তাই তাকে মামলা রেকর্ড ছাড়া গ্রেপ্তার করা ঠিক হবে কি না এই দ্বিদ্ধা দ্বন্দে পড়ে যায় খিলক্ষেত থানা পুলিশ। কিন্তু যুগ্ন-কমিশনার শেখ নাজমুল আলম ওসিকে ডিএমপির নতুন কমিশনারের আদেশের কথা স্মরণ করিয়ে দেন দায়িত্ব অবহেলার বিষয়ে। ওসি মোস্তাফিজুর বলেন, বুধবার রাতে যুগ্ন-কমিশনার শেখ নাজমুল আলম স্যারের কাছে ফোনে একটা সংবাদ শুনে ফেসবুকে শিশুটির উপর নির্যাতনের ছবিগুলো দেখে স্যারের সহায়তায় শিশুটির পরিবারের সদস্যদের মাধ্যমে তার মায়ের সাথে কথা বলি।

তাকে শিশুটিকে ঢাকা মেডিকেলের ওসিসিতে ভর্তি করানোর কথা বলি। তাকে এজাহার দেওয়ার জন্য অনুরোধ করলে তিনি এত রাতে একাকী আসতে পারবেন না বলে জানান। একটি বিষয় মাথায় ঘুরতে থাকলো কাল সকাল পর্যন্ত অপেক্ষা করলে যদি অপরাধী পালিয়ে যায় তখন কি হবে। তাই আমি আমার সিদ্ধান্ত নিয়ে ডিসি ও এসি স্যারের সাথে পরামর্শ গ্রহণ করি।’’

তিনি আরো বলেন, “একই সাথে দুটো কাজ হাতে নিই। প্রথমতঃ অপরাধী আলী তারিককে গ্রেপ্তারের জন্য শিশুটির মায়ের নিকট থেকে ঠিকানা সংগ্রহপূর্বক গ্রেপ্তার অভিযান পরিচালনা ও শিশুটির মায়ের নিকট থেকে এজাহার সংগ্রহ করা।

আমদের ঐকান্তিক প্রচেষ্টায় শিশুটির মাকে নিরাপত্তা নিশ্চিত করে তার নিকট থেকে এজাহার সংগ্রহ করি এবং একই সাথে অপর দুটি টিম গভীর রাতে তারিক আলীর বাড়ী সনাক্ত করে তার বাড়ীর চতুর্থ তলা থেকে তাকে পুলিশ হেফাজতে নেয়া হয়।“ শিশুর প্রতি অমানবিক নির্যাতন করার কারণে শিশু আ্ইন ২০১৩ এর ৭০ ধারায় তার বিরুদ্ধে মামলা রুজু করা হয়। মামলা নং ২৯,তারিখ ১৯/০৯/২০১৯ ইং।

এসআই মোঃ মিজানুর রহমান বলেন, “ আসামিকে বিজ্ঞ আদালতে প্রেরণ করা হয়েছিল পাঁচ দিনের রিমান্ড চেয়ে। কিন্তু আদালত আসামিকে জেলগেটে জিজ্ঞাসবাদের অনুমতি  দিয়েছে। আসামি তারিখ এখন কারাগারে।

পুলিশের েএম সেবা পেয়ে বাদী শাওন শরমিলা বলেন, এই পুলিশ আসলে সেই পুলিশ নয়। আগে শুনতাম মামলা করতে গেলে থানা পুলিশের কাছে অনেক ধর্না দিতে হয়। কিন্তু আমি দেখলাম সিনিয়র পুলিশ অফিসারদের হস্তক্ষেপে থানা পুলিশের টিম নিজেরা সেই খিলক্ষেত থেকে গভীর রাতে ধানমণ্ডিতে এসে আমার কাছে থেকে লিখিত অভিযোগ নিয়ে গেছেন। সাথে সাথে আসামিকে গ্রেপ্তারও করেছেন। আপ্লুত শাওন বলেন. আমি পুলিশের এই সেবার জন্য খুবই খুশি। আশা করি ন্যায় বিচার পাবো।


এস এস