ন্যাভিগেশন মেনু

তীব্র খাদ্যসংকটের মুখোমুখি উত্তর কোরিয়া


উত্তর কোরিয়ায় অতীতের মতো সামনে মারাত্মক খাদ্য সংকট হতে পারে বলে হুঁশিয়ারি দিয়েছেন দেশটির নেতা কিম জং উন। এজন্য তিনি দেশটিতে খাদ্যশস্যের উৎপাদন বাড়ানোর ওপর জোর দিয়েছেন।

বুধবার (২৩ জুন) বিবিসি বাংলা প্রতিবেদন থেকে এমন তথ্য জানা যায়।

প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, দেশটিতে যে খাদ্যের সংকট তৈরি হয়েছে তার সবচেয়ে স্পষ্ট ইঙ্গিত পাওয়া যাচ্ছে সবচেয়ে প্রয়োজনীয় খাদ্য সামগ্রীর দাম বেড়ে যাওয়ায়। এক কিলোগ্রাম ভুট্টার দাম গত ফেব্রুয়ারিতে হঠাৎ বেড়ে দাঁড়ায় ৩ হাজার ১৩৭ ওয়ানে (প্রায় দুই মার্কিন ডলার)। এই তথ্য পাওয়া যাচ্ছে ডেইলি এনকে ওয়েবসাইট থেকে, যারা উত্তর কোরিয়ায় তাদের বিভিন্ন সূত্র হতে এসব সংগ্রহ করে।

এশিয়া প্রেস ওয়েবসাইটের খবর অনুযায়ী, এরপর আবারও প্রয়োজনীয় খাদ্য সামগ্রীর দাম দ্রুত বাড়তে থাকে জুনের মাঝামাঝি। এই ওয়েবসাইটটি উত্তর কোরিয়ার মানুষের সঙ্গে যোগাযোগ রাখে পাচার করা কিছু ফোনের মাধ্যমে।

উত্তর কোরিয়ার মানুষ ভুট্টার চেয়ে ভাত বেশি পছন্দ করে, কিন্তু তারপরও তারা ভুট্টা বেশি খায়, কারণ এটি দামে সস্তা। এদিকে চালের দামও কিন্তু বেড়ে গেছে। রাজধানী পিয়ংইয়ং-এ ২০২০ সালের ডিসেম্বরের পর চালের দাম সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছেছে।

উত্তর কোরিয়া বিষয়ক বিশেষজ্ঞ বেনজামিন সিলবারস্টাইন বলেন, উত্তর কোরিয়ার বাজার মনিটরিং করে দেশটির অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড সম্পর্কে সবচেয়ে ভালো তথ্য পাওয়া যায়, কারণ উত্তর কোরিয়ার মানুষ বাজারে গিয়ে লেনদেনের মাধ্যমেই তাদের খাবার এবং অন্যান্য প্রয়োজনীয় পণ্য কেনে। সরকারি কর্মচারীদের একেবারে ক্ষুদ্র একটি অংশই কেবল রাষ্ট্রের কাছ থেকে খাদ্য সাহায্য পেয়ে থাকে।

উত্তর কোরিয়ার নেতা কিম জং উন খাদ্য সংকট সম্পর্কে যে হুঁশিয়ারি দিয়েছিলেন, তাতে তিনি গত বছর টাইফুন (ঘূর্ণিঝড়) এবং বন্যায় ফসলের ক্ষতির কথা উল্লেখ করেছিলেন।

প্যারিসভিত্তিক কৃষি পর্যবেক্ষণ সংস্থা জিওগ্লামের হিসেবে, ১৯৮১ সালের পর গত বছরের এপ্রিল থেকে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত সময়ে উত্তর কোরিয়ার ইতিহাসে সবচেয়ে বেশি বৃষ্টি হয়েছে। একের পর এক টাইফুন, আঘাত হেনেছে কোরিয়ান উপদ্বীপে। এরমধ্যে তিনটি টাইফুন উপকূলে আঘাত হেনেছিল গত আগস্ট এবং সেপ্টেম্বরে মাত্র দুই সপ্তাহের মধ্যে। উত্তর কোরিয়ায় এই সময়টি ছিল ধান এবং ভুট্টার ফসল তোলার মৌসুম।

জুন মাস নাগাদ খাদ্য দুষ্প্রাপ্য হয়ে উঠতে পারে, কারণ আগের বছরের শরৎকালের ফসল থেকে সরকার যে খাদ্য মওজুদ গড়ে তোলে, সেটা ততদিনে প্রায় ফুরিয়ে যায়, বিশেষ করে কোনো বছর যদি ফসল মার খায়।

গত বছরের আগস্টের শুরুতে টাইফুন 'হাগুপিট' আঘাত হেনেছিল এবং এটি ছিল এমন একটি দুর্যোগ, যেটির ক্ষয়ক্ষতির বিস্তারিত বিবরণ রাষ্ট্রীয় প্রচারমাধ্যমে প্রকাশ করা হয়েছিল। তখন বলা হয়েছিল, বন্যায় ৪০ হাজার হেক্টর (এক লাখ একর) ক্ষেতের ফসল নষ্ট হয়েছে এবং ১৬ হাজার ৬৮০টি ঘরবাড়ি নষ্ট হয়েছে।

তবে এরপর আরও যেসব প্রাকৃতিক দুর্যোগ ঘটেছে, সেগুলোর ক্ষয়ক্ষতির বিবরণ রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যমে এড়িয়ে যাওয়া হয়।

উত্তর কোরিয়ায় কয়েক দশক ধরে যেভাবে বনাঞ্চল উজাড় করা হয়েছে, তার ফলে এসব প্রাকৃতিক দুর্যোগে ক্ষয়ক্ষতি আরও বেশি করে হচ্ছে।

এ ছাড়াও উত্তর কোরিয়ার কৃষিখাতের যে সমস্যাটির কথা খুব কম জানা যায়, সেটি হচ্ছে সারের সংকট। সেখানে উৎপাদন বাড়ানোর জন্য যথেষ্ট সার জোগাড় করার খুবই কঠিন। খাদ্য উৎপাদন বাড়াতে সার কতটুকু গুরুত্বপূর্ণ, সেটি প্রায়শই উত্তর কোরিয়ার সরকারি টেলিভিশনে তুলে ধরা হয়।

২০১৪ সালে কিম জং আন এক চিঠিতে কৃষি খাতের শীর্ষ কর্মকর্তাদের মনে করিয়ে দিয়েছিলেন যে, তারা যেন বিকল্প হিসেবে সহজে পাওয়া যায় এমন সারের উৎস খুঁজে বের করেন।

রাষ্ট্রীয় সংবাদ সংস্থা কেসিএনএ'র প্রকাশ করা এক চিঠিতে তিনি লিখেছিলেন, 'সব ধরনের গোবর ব্যবহার করুন, যেমন গৃহপালিত পশুর গোবর, মানুষের মল, গোবর সার, এবং খাদের তলার মাটি।'

উত্তর কোরিয়া সার উৎপাদনে স্বয়ংসম্পূর্ণ নয়। তাই খাদ্যের জন্য তাদের চিনে উপর নির্ভর করতে হয়। কিন্তু কোভিড-১৯ শুরু হওয়ার পর চিন হতে উত্তর কোরিয়ায় খাদ্য রপ্তানি ৮০ শতাংশ কমে গেছে।

সাম্প্রতিক বছরগুলোতে চিন হতে উত্তর কোরিয়ায় মোট রপ্তানির পরিমাণ ছিল আড়াইশো কোটি ডলার হতে সাড়ে তিনশো কোটি ডলার। কিন্তু চিনের শুল্ক দপ্তরের দেওয়া হিসেব অনুযায়ী, গত বছর এই বাণিজ্যের পরিমাণ ছিল ৫০ কোটি ডলারের নীচে।

জাতিসংঘ বলছে, গত দশকে দাতা দেশগুলো হতে উত্তর কোরিয়ায় যথেষ্ট ত্রাণ সাহায্য যায়নি।

আর বেশিরভাগ আন্তর্জাতিক খাদ্য ত্রাণ সংস্থা এই মূহুর্তে উত্তর কোরিয়ায় কাজ করতে পারছে না, কারণ কোভিডের কারণে জারি করা বিধিনিষেধ মেনে সেখানে তাদের কাজ করা স্বাভাবিক সময়ের তুলনায় আরও কঠিন হয়ে পড়েছে।

জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থার রিপোর্ট অনুযায়ী, উত্তর কোরিয়ার প্রায় দুই থেকে তিন মাসের সরবরাহের পরিমাণ খাদ্য ঘাটতি রয়েছে।

রিপোর্টে বলা হয়, ‘যদি বাণিজ্যিকভাবে আমদানি এবং খাদ্য ত্রাণের মাধ্যমে এই ঘাটতি মেটানো না হয়, তাহলে ২০২১ সালের আগস্ট থেকে অক্টোবর পর্যন্ত উত্তর কোরিয়ার পরিবারগুলো খুবই কঠিন এক মঙ্গার মুখোমুখি হবে।’

উত্তর কোরিয়া যেরকম কঠোর গোপনীয়তায় ঢাকা একটি রাষ্ট্র, সেখান থেকে কোন নির্ভরযোগ্য তথ্য পাওয়া খুবই কঠিন কাজ।

সিবি/এডিবি/